Friday, 10 November 2017

সাম্প্রতিক কালের ঝুমুরিয়া শিল্পীগণ

আধুনিক যুগের ঝুমুরিয়া শিল্পীদের ঝুমুর রচনায় সর্বাধুনিক চিন্তা-ভাবনার ছাপ পড়েছে। সলবত মাহাত, কৃত্তিবাস কর্মকার, কুচিল মুখোপাধ্যায়, ধ্রুবসিং সর্দার, সদানন্দ সিং মুড়া সাম্প্রতিক কালের ঝুমুরিয়া শিল্পীদের মধ্যে অন্যতম। এদের রচনায় ঝুমুরগীতের বিষয়ে রাজনীতি, সামাজিক সমস্যা, লৌকিক সংস্কারগুলি জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

সলবত মাহাতো
সাম্প্রতিক কালের ঝুমুরিয়া শিল্পীদের আলোচনায় সর্বাগ্রে যে নামটি আসে, তিনি হলেন সলবত মাহাতো। ঝুমুরিয়া শিল্পী সলবত মাহাতো ১৩৩৫ বঙ্গাব্দে পুরুলিয়া জেলার লটপদা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। রাধাকৃষ্ণ বিষয়কঝুমুর, ভাদরিয়া, নাচনীশালিয়া, দাঁইড় ধরা ঝুমুরগীত তাঁর শিল্প সত্তাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। মনসামঙ্গলের জাত ধর্ম থেকে মনসামঙ্গলের কাহিনীকে ঝুমুরগীতে পরিবেশনের অসাধারণ দক্ষতা তাঁকে জনপ্রিয় করে তুলেছে। ঝুমুর গানে অসাধারণ প্রতিভার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর সলবত মাহাতোকে “লালন পুরস্কারে” সম্মানিত করে।

কৃত্তিবাস কর্মকার
ঝুমুরিয়া শিল্পী কৃত্তিবাস কর্মকার ১৩৪৯ বঙ্গাব্দে পুরুলিয়া জেলার গোবিন্দপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর রচিত ঝুমুরগুলি মানভূমি বাংলা উপভাষায় কুর্মালী ভাষার মিশ্রণে সম্পূর্ণ আঞ্চলিক কাঠামোকে প্রকাশ করেছে। ঝুমুরগীতে সামাজিক বিষয়গুলি সুন্দরভাবে ফুঁটে উঠেছে। তাঁর রচিত কূর্মালী ঝুমুরগীত রাঁচি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে চালু আছে।


কুচিল মুখোপাধ্যায়
ঝুমুরিয়া শিল্পী কুচিল মুখোপাধ্যায় ১৩৫১ বঙ্গাব্দে পুরুলিয়া জেলার রামনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সাম্প্রতিক কালের ঝুমুরিয়া শিল্পীদের তুলনায় তিনিই একমাত্র প্রথাগত শিক্ষিত ঝুমুরিয়া শিল্পী। তাঁর রচিত ঝুমুরে আঞ্চলিক বাংলা উপভাষার শব্দবলী ও ভাষা কাঠামো বজায় আছে, আঞ্চলিক ছোটগল্পের ‘বুনন’ ঝুমুরগীতে প্রকাশ পায়। তিনি আধুনিক যুগের সমস্যাবলী ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিমায় ঝুমুরের ঢঙে প্রকাশ করেছেন। তাঁর গানে প্রচ্ছন্নভাবে লোকসংগীত শিল্পী দিনেন চৌধুরী ও গীতা চৌধুরীর গাওয়া লোকগীতিগুলি সঞ্চারিত হয়েছে। ‘যাইকরার ভালু সংহার’, ‘গুড় গোলমরিচ জিরা’ ইত্যাদি ঝুমুরগীতগুলি পুরুলিয়া অঞ্চলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। কুচিল মুখোপাধ্যায় তাঁর ঝুমুরগীতগুলিকে ক্যাসেট করে সংরক্ষণ ও উপজীবিকার ব্যাবস্থা করেছেন। তিনি ছায়াছবি ‘সজনী লো সজনী’তে নেপথ্য কণ্ঠ সঙ্গীতে ঝুমুরগীত পরিবেশন করেছেন।

Sunday, 5 November 2017

ঝুমুরগীতে আধুনিকযুগ

অনেকের মতে চন্ডীদাসের লেখা শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ঝুমুর গানের প্রাচীনতম নিদর্শন। কৃষ্ণকীর্তনের ভাষা বাঁকুড়া, মানভূম তথা ঝাড়খন্ড অঞ্চলের লৌকিক ভাষা। রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা ঝুমুর গানের একটা বড় জায়গা জুড়ে রয়েছে। আবার যে শিক্ষিত গীতাকার ও সুরকাররা এই গানে এলেন তাদের একটা বড় অংশ বৈষ্ণব ভাবধারায় দীক্ষিত হওয়ার ফলে ঝুমুর গানে বৈষ্ণব ভাবধারা ও কীর্তনের সুর আরও বেশি করে প্রবেশ করতে থাকে। মানুষে প্রেমের সঙ্গে মিশে গেল রাধাকৃষ্ণের ধর্মীর প্রেরণা। রাজা-মহারাজা ও বিত্তশালীদের দরবারে গাওয়া উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে প্রভাব যুক্ত দরবারি ঝুমুরে এই বৈষ্ণব ভাবধারার ছাপ স্পষ্ট। সামন্তপ্রভু, জমিদার, ধনাঢ্য ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতায় ঝুমুরগীত বিচিত্রভাবে সৃজনশালী হয়ে ওঠে। ঝুমুরের শিল্পকর্মও পরিশীলিত রুপ পায়। রাধাকৃষ্ণের প্রেম, মিলন ও বিচ্ছেদ বৈষ্ণব পদাবলী প্রভাবিত এই ঝুমুরের বিষয়। রামায়নের বেশ কিছু অংশও এই সময় ঝুমুর গানে ঢোকে। এই সময় থেকেই ঝুমুর গানের নীতিকার ও সুরকারদের মধ্যে শিক্ষিত উচ্চবর্গের মানুষরা আসতে থাকেন।


মৌখিক গানের জায়গায় আসে লিখিত গান। সুরের বৈচিত্র কথা ও উৎকর্ষে কোন নির্দিষ্ট শ্রেণি বা জাতপাতের মধ্যে আটকে না থেকে ঝুমুর গান সাধারণভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করে। আপন খেয়াল মাঠে ঘাটে, আনন্দেবিরহে গেয়ে ওঠা ঝুমুর গান ও নাচেও এল সুনির্দিষ্ট কাঠামো। লোকসাধারনের মধ্যে মেলা প্রাঙ্গণে নাচ গানের প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধি পায়। ফলস্বরুপ দরবারী আসর থেকে ঝুমুর উঠে আসে মুক্ত প্রাঙ্গণে। রাস, দোল উৎসব, চড়ক, ইন্দুপুজো, শিব রাত্রি উপলক্ষে ঝুমুর গাহার জনপ্রিয়তা ব্যপক হারে বৃদ্ধি পায়। লৌকিক সংস্কৃতির ঝুমুর গানের সঙ্গে আসর মাতিয়ে দিল নাচনীদের নাচ। মৌখিক এবং লিখিত ঝুমুর গানের তফাৎ এই পর্ব থেকেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জমিদার আর রাজাদের দরবার পেরিয়ে ঝুমুর হয়ে উঠতে লাগলো মানুষের গান। আধুনিক যুগে ঝুমুরগীতের পরিবেশনরীতির অভিনবত্ব লক্ষ্য করা যায়। হারমোনিয়াম, ডুগডুগি-তবলা সহযোগে ঝুমুরগীত পরিবেশন আধুনিক যুগের ঝুমুরগীতের নবতম সংযোজন। 

Saturday, 4 November 2017

পৌরাণিক প্রসঙ্গে ঝুমুরের বিবর্তন

লৌকিকতার আঙ্গিক ছাপিয়ে ঝুমুর গান প্রভাবিত হয় পৌরাণিক কাহিনী দ্বারা। পুরান কথা উঠে আসে ঝুমুরের গানে। এরফলে ঝুমুর গান পৌঁছে গেল আরও বৃহত্তর সীমানায়। কৃষক-মুজুর শ্রেণী হয়ে ঝুমুর গান প্রবেশ করল আভিজাত বর্গে। সামন্তপ্রভুরা নিজেদের আভিজাত্য বা ঠাট বজায় রাখার জন্য জাঁকজমক করে ঝুমুরের আসর বসাত। উৎকৃষ্ট ঝুমর রচয়িতাদের সমাদরও বেড়ে গিয়েছিল।

পৌরাণিক ঝুমুর:  ষোড়শ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বিক্ষিপ্তভাবে দু'একটি রাধা-কৃষ্ণের লীলাভিত্তিক ঝুমুর গান তৈরি হয়েছিল। পরে পৌরাণিক আখ্যান নির্ভর ঝুমুর তৈরি হতে থাকে। বিশেষ করে হিন্দু পৌরাণিক কাহিনীভিত্তিক ঝুমুরের বিকাশ ঘটেছিল উত্তরবঙ্গ, রাঢ় বাংলা এবং দক্ষিণ-মধ্য বঙ্গে। এক্ষেত্রে বৈষ্ণবধর্মাবলম্বীদের দ্বারা ঝুমর প্রভাবিত হয়েছিল। এর ফলে লৌকিক ভাদরিয়া ঝুমুরের অনুপ্রবেশ ঘটে 'পৌরাণিক ঝুমুর'-এ। সব মিলিয়ে ভাদরিয়া গান মধ্যুযুগে হয়ে উঠেছিল ধর্ম-কর্মের গান। পৌরাণিক ঝুমুরের প্রধান ধারা রাধা-কৃষ্ণের লীলা– “গোবিন্দের লীলা / নিরমল সুখশিলা/ শুদ্ধ জ্ঞান আছিল হে–তিলমাত্র /কাম গন্ধ না ছিল।” 

গাহা ঝুমুর: ১৩৫০ খ্রিষ্টাব্দের পরে নাগরিক সঙ্গীত ধারায় শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ও বিদ্যাপতি বাংলা সাহিত্য এবং সঙ্গীতের নূতন অঙ্গ যুক্ত হয়। সংস্কৃত কাব্য গীতগোবিন্দ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন এবং বিদ্যাপতির রচনার ভিতর দিয়ে কীর্তন-সাহিত্য এবং কীর্তন-গানের আদিপর্বের সূচনা হয়েছিল। এই ধারা বাংলা লোকসঙ্গীতের ঝুমুর গানে নতুন বিষয়বস্তু যুক্ত করার ক্ষেত্র রচনা করেছিল। কথিত আছে ১৫০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে শ্রীচৈতন্য ঝাড়খণ্ডের উপর দিয়ে পুরী থেকে বৃন্দাবন যাত্রা করেন। এই সময় বৈষ্ণবদর্শন বা বৈষ্ণব গানের বিষয় ঝুমুরে সঞ্চালিত হয়। এই সময়ের ভিতরে বাংলা গাহা ঝুমুর পূর্ণতা লাভ করেছিল বলে অনুমান করা যায়। এই সূত্রে অনুষ্ঠানভিত্তিক গাহা গানে পৌরাণিক ভাব ধারা যুক্ত হয় এবং পৌরাণিক ঝুমুরের সূত্রপাত ঘটে।

বৈঠকী ঝুমুর: মধ্যযুগীয় বাংলা গানের ক্রমবিবর্তনের ধারায় বৈঠকী ঝুমুর একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। কারণ এই ঝুমুর থেকেই তৈরি হয়েছিল উনবিংশ শতাব্দীর দরবারি ঝুমুর। বৈঠকী ঝুমুরের শুরুর দিকে স্থানীয় সামন্তপ্রভুরা বড় করে আসার বসিয়ে ঝুমুর গান শুনতো এবং সামন্তপ্রভুরা নিজেদের আভিজাত্য বা ঠাট বজায় রাখার জন্য জাঁকজমক করে ঝুমুরের আসর বসাতো। এই সূত্রেই তৈরি হয়েছিল 'বৈঠকি ঝুমুর'। এই ঝুমুরগুলোর বিষয়বস্তু ছিল লৌকিক ঝুমুর বা পৌরাণিক ঝুমুর।

দরবারি ঝুমুর: মধ্যযুগের শেষের দিকে জমিদার, মানকি, ধনাঢ্য ব্যক্তিদের আনুকূল্যে দরবারি ঝুমুরের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে উনিশ শতকের ব্রিটিশ ভারতের কলকাতায় এ সকল অভিজাত ও ধনাঢ্যদের একাংশের দ্বারা সৃষ্টি হয়েছিল বাবু-সংস্কৃতি। এরা সখের নাট্যদলের জন্য অর্থ ব্যয় করতো। এদের জলসা ঘরে বসতো খেয়াল, ধ্রুপদ, টপ্পা, ঠুমরি গানের আসর। একসময় এই আসরে জায়গা করে নিয়েছিল ঝুমুর ও খেমটা নাচ গান। বাবুদের অর্থ এবং কৌলিন্যের প্রতিযোগিতার সূত্রে উৎকৃষ্ট ঝুমুর দলকে নির্বাচন করা হতো। কে কত উৎকৃষ্টমানের ঝুমুর দলকে দিয়ে অনুষ্ঠান করাতে পারে, তার প্রতিযোগিতা ছিল। এই সূত্রে উৎকৃষ্ট ঝুমর রচয়িতাদের সমাদরও বেড়ে গিয়েছিল। উৎকৃষ্ট ওস্তাদের নামে আসরের গৌরব বাড়ত। এই সূত্রে মধ্যযুগীয় পদকর্তাদের মতো ঝুমুর গানে ভনিতা যুক্ত হতে থাকে। আদি ঝুমুরের সরল বাণীর সাথে যুক্ত হতে থাকে নানা ধরনের কূটকৌশল। ফলে ধীরে ধীরে আদি ঝুমুরের সারল্য নষ্ট হওয়া শুরু হয়। এছাড়া এ সকল গানে আঞ্চলিক শব্দের স্থানে প্রমিত, পরিশীলিত শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটা শুরু হয়। একালে বসে আদি ঝুমুরে ব্যবহৃত শব্দের অর্থ খুঁজে পাওয়ার জন্য প্রাচীন আঞ্চলিক অভিধানের দ্বারস্থ হতে হয়, পক্ষান্তরে দরবারি ঝুমুরে বাণীর কূটকৌশল উদ্ধারের জন্য হন্যে হয়ে গুরুর সন্ধান করতে হয়। অনেক সময় দরবারি ঝুমুরে এক ওস্তাদ অন্য ওস্তাদ বা শ্রোতাদের সামনে, কবি গানের মতো কূট প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতেন। বৈঠকী ঝুমুরে কীর্তনের প্রভাব ছিল। সেকারণে আদি ঝুমুরের বাদ্যযন্ত্রের পাশাপাশি দরবারি ঝুমুরে কীর্তনের খোল ও করতালের ব্যবহার শুরু হয়েছিল। এছাড়া ঝুমুরের এই পর্যায়ে পুরাণ কাহিনির পাশাপাশি সহজিয়া বাউলতত্ত্বের অনুপ্রবেশ ঘটা শুরু হয়েছিল।

Friday, 3 November 2017

লৌকিকতার আঙ্গিকে ঝুমুর

কৃষিকাজের বাইরে পুরুষরা বিভিন্ন স্থানে নানা প্রয়োজনে স্বতন্ত্র 'হাকা' গান পরিবেশন করতো। এ সকল গানের আঞ্চলিক নাম ছিল ‘টাইড় গীত’ ও ‘উধআ গীত’। এদের ভিতর একক পরিবেশনযোগ্য গানের নাম ছিল ‘এক্যাইড়া’। ঝুমুর গায়করা নানাস্থানে এই ধরনের গান একা পরিবেশন করতো। সেই কারণে এই জাতীয় গানগুলোকে বলা হতো ছুট গান। এই গান এককভাবে বা অনেকে মিলে তৈরি হতো মুখে মুখে। সেকালের কবিরা এসকল গানে নিজের প্রচার করতেন না। ফলে এসকল গানে ভণিতা ছিল না। ৬৫০ থেকে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দের পরে রচিত চর্যাপদে ভণিতা যুক্ত করেছিলেন নাগরিক পদকর্তারা। বাংলা লোকগানে এ রীতির তখনও প্রচলন হয় নি। লক্ষ্যণীয় বিষয়, 'হাকা' গানের কোনো প্রকরণেই দেবদেবী ছিল না। এই গানের বিষয়বস্তুতে ছিল শুধুই কর্মজীবী মানুষের সুখ-দুঃখের কথা। এই কারণে এই পর্যায়ের ঝুমুর ছিল 'লৌকিক ঝুমুর'।


লৌকিক ঝুমুর: মধ্যযুগের প্রথমার্থ জীবন-জীবিকার সূত্রে সৃষ্ট জীবনঘনিষ্ট ঝুমুর সাধারণ মানুষের কাছে আদরণীয় ছিল। সমাজের সাধারণ কৃষক, কামার, কুমোর, জেলে ইত্যাদি ছিল এই জাতীয় ঝুমুরের শ্রোতা-দর্শক। ফলে এই গানে চটুলতা, প্রাত্যহিক জীবনের হাল্কা রসিকতা, আনন্দ-বেদনার কথা বিশেষভাবে উপস্থাপিত হতো। দৈনন্দিন জীবনের কথা, কর্মজীবনের কথা, প্রকৃতির বর্ণনা পাওয়া যায় এ সব ঝুমুর গানে। মাঠের বা আঙিনার শ্রোতাদের শ্রবণযোগ্য করা জন্য উচ্চস্বরের গান করা হতো। এতে সুরের বা তালের জটিল বিন্যাস ছিল না। এই গানে শুদ্ধ ও কোমল স্বরের সহজাত বিন্যাস ছিল। তবে এতে জটিল ও বক্রস্বরের প্রাধন্য ছিল না। যন্ত্রানুষঙ্গ হিসেবে ধামসা, মাদল, ঘুঙ্গুর, বাঁশী ব্যবহৃত হতো। লৌকিক ঝুমুরের পরিবেশনগত বিষয় অনুসারে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়—

  • দাঁইড়শালিয়া ধারা: দাঁইড়শালিয়া ধারাটি সাধারণভাবে দাঁড় ঝুমুর বা টাঁড় ঝুমুর বলা হয়। টাঁড় শব্দটির অর্থ হলো মাঠ। একে মেঠো ঝুমুরও বলা যায়। এই জাতীয় ঝুমুরে কৃষি-বাংলার মাঠের সাথে সম্পর্কিত বিষয় উপস্থাপন করা হয়। প্রধানত মাঠের কাজে নিয়োজিত পুরুষরা পরিবেশন করে থাকে। তবে উৎসবেও এই ঝুমুর পরিবেশিত করা হয়। এই ঝুমুরে ধামসা, মাদল, ঘুঙ্গুর প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হয়ে থাকে। অনাড়ম্বর পরিবেশে গানের ভিতর দিয়ে জীবনের দুঃখবেদনা ভুলে কিছুক্ষণ আনন্দের মধ্যে ডুবে থাকার প্রেরণায় এই গান পরিবেশিত হয়। কিছু কবি শুধু কবি ঝুমুর গেয়েই জীবিকা নির্বাহ করতো। ফলে এই ঝুমুরে পেশাগত শৃঙ্খলা ও দক্ষতা গড়ে উঠেছিল।
  • পাতাশালিয়া ধারা: একে বলা হয় পাতানো আসরের গান। বিশেষভাবে আয়োজিত আসরে এই গান পরিবেশন করা হয়। বর্তমানে করম উৎসবকে কেন্দ্র করে এই গানের আসর বসে। উল্লেখ্য, করম উৎসব ধান তোলার বা ধানের বীজ রোপণ জাতীয় কৃষিকাজভিত্তিক। রাঢ় অঞ্চলে ভাদ্রমাসের শুক্লা একাদশী তিথিতে করম পূজা হয়ে থাকে। নারী পুরুষ সমবেত সঙ্গীত ও নৃত্যের এই উৎসব পালিত হয়। এই গান পাতানাচাড়ী অথবা মাদল নাচের গান নামেও পরিচিত। চলমান জীবনযাত্রায় নানা ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠানের সৃষ্টি হয়েছিল। যেমন নবান্ন, অন্নপ্রাসন, বিবাহ ইত্যাদি। এসকল অনুষ্ঠানে ঝুমুর গানের প্রচলন শুরু হয় মূলত মধ্যযুগে। মধ্যযুগের এই ঝুমুরগুলোকে সাধারণভাবে বলা হয় 'ঝুমুর গাহা'।

ভাদরিয়া ঝুমুর: ভাদরিয়া ঝুমুর মধ্যযুগের লৌকিক ঝুমুরের একটি প্রকরণ ছিল। ভাদ্রমাসের প্রাকৃতিক পরিবেশ নির্ভর এই গানে পাওয়া যায় কর্মজীবী মানুষের জনজীবনের প্রতিচ্ছবি। ঝাড়গ্রামের পাহাড়ি নদী, বৃক্ষরাজি, ফসলের মাঠের সৌন্দর্য এই গানে পাওয়া যায়। কৃষকের নতুন ধানের চারা রোপণের আনন্দ ও একই সাথে ভাদ্র মাসের অভাব-অনটনের চিত্রও এই গানে ফুটে ওঠে। নৃত্য, গীত ও বাদ্য সহযোগে ঝুমুর গাওয়া হয়, সে কারণে ঝুমুরকে অনেকে পূর্ণাঙ্গ সঙ্গীত হিসেবে অভিহিত করে থাকেন। সহজাত ছন্দ অনুসরণ করে সুরের চলন রচিত হতো। এর অন্যতম ছিল ২।২ ও ৩।৩ মাত্রা ছন্দ। পরবর্তী সমায়ে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত এবং কীর্তনের প্রভাবে গানগুলো তালের আবর্তনে বাঁধা পড়ে যায়। গোড়ার দিকে সাঁওতালি ঝুমুরের মতো বাংলা ঝুমুরের বাদ্যযন্ত্র ছিল বাঁশি ও ঢোলক। কালক্রমে বাদ্যযন্ত্রের তালিকায় যুক্ত হয়, হারমোনিয়াম, তবলা, কখনো কখনো পাখোয়াজ। একই সাথে যুক্ত হয় নানা ধরনের তাল।

Wednesday, 1 November 2017

ঝুমুরিয়া সুরের স্থানীয় নাম ও নামকরণ পদ্ধতি

ঝুমুর গানের সুর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় ইহা কোন সঙ্গীত শাস্ত্রের নির্দিষ্ট নিয়মানুযায়ী গতির অনুসরণ করে না।তবে কোন একটি ঝুমুরের সুর সুক্ষ্মভাবে বিশ্লেষিত করলে তার মধ্যে দু-তিনটি রাগিণীর মিশ্রণ ধরা পড়ে। প্রকৃতপক্ষে ঝুমুর দেশীয় লোকসঙ্গীত এবং এর সুর নিজস্ব। সুরের জন্য ঝুমুর অপরের কাছে ঋণী নহে। মোটের উপর বলা চলে, আর্যদের বা হিন্দুদের সংগীত শাস্ত্র ঝুমুরের আদর্শ নিয়ন্ত্রণ করেনি। এরজন্যই সঙ্গীত দামোদরে ঝুমুরকে বর্ণাদি নিয়মের ব্যতিক্রমকারী বলা হয়েছে। ঝুমুর সুরের নাম কোন রাগ-রাগিণীর নামে দ্বারা নির্দিষ্ট হয় না। ঝুমুরের সুরের স্থানীয় নাম প্রচলিত আছে। এক এক স্থানে ঝুমুর সুরের নাম একেকপ্রকার হয়। ঝুমুর সুরের নামকরণের নীতি-

l কোন প্রদেশ বা স্থানের নামানুসারে কতগুলি ঝুমুর সুরের নামকরণ হয়েছে। যেমন- তামাড়, বাগমুড়া, শিখর্যা, গোলোয়ারি ইত্যাদি। রাঁচির তামাড়, মানভূমের বাঘমুন্ডি ও শিখরভূম এবং হাজারিবাগের গোলা নামক স্থানের নামে ঝুমুর সুরের নামকরণ হয়েছে।

l কালানুসারেও ঝুমুরের নামকরণ হয়ে থাকে। যেমন- ভাদরিয়া, চৈতালী। ভাদ্র ও চৈত্র মাসে এই সুরের ঝুমুর গাওয়ার রীতি প্রচলিত থাকায় মাসের নামে এইরুপ নামকরণ হয়েছে।

l তালের নামানুসারে কয়েকটি ঝুমুরের সুর অভিহিত হয়। যথা- খ্যামটা, ছপকা প্রভৃতি। আবার ভাবানুসারেও কতগুলি ঝুমুরের নামকরণ হইয়াছে। যেমন- উদাস্যা, বিবাগ্যা ইত্যাদি।

l ঝুমুরের আসরের নামানুসারে সুরের নামকরণ হয়ে থাকে। যেমন, দাঁড় বা ছৌ এর আসরে ‘দাঁড়-ধরা’ বা ‘ছোহালী’ ঝুমুর গাওয়ার রীতি প্রচলিত আছে।

l মিশ্র সুর থাকলে যাহার সুর ঝুমুরের সাথে মিশে গিয়েছে তার নামেই ঝুমুরগুলির নাম দেওয়া হয়। কীর্তনের ঢঙে যেসব ঝুমুর গাওয়া হয় তাদের ‘কীর্তন-ঝুমুর’ আখ্যা দেওয়া হয়। ‘কাজরী-ঝুমুর’ এইরুপ ভাবেই মিশ্র নাম পেয়েছে।



উক্তরুপ ঝুমুরের সুরগুলির নামকরণ হয়ে থাকলেও এইসব সুরের নাম মুখে মুখেই প্রচলিত। ঝুমুরের শীর্ষদেশে ও সর্বশেষে কোথাও সুরের নাম লিখিত পাওয়া যায়না। তবে ‘ভাদরিয়া’ সুরটি কেবল মুদ্রিত আছে। ঝুমুর গান স্থানীয় ভাষায় রচিত হলেও গীতরচনায় মিশ্র বাংলা ভাষার প্রভাবই বেশী চোখে পড়ে। রাঢ় বাংলার মধ্যে বিহারের ঝাড়খণ্ডের কিছু অংশের অস্তিত্ব আছে বলে দেখা যায়, তাই এখানকার ঝুমুর গানে হিন্দি ভাষার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এই ঝুমুর গানগুলিকে ঝাড়খণ্ডি ঝুমুর বলে আখ্যা দেওয়া হয়। আবার চা বাগান, কয়লাখনি অঞ্চলে প্রভৃতি কর্মস্থলে বিভিন্ন জাতির মানুষের সমাবেশ হয় বলে অর্থাৎ শ্রমিক বৃন্দের মধ্যে একটা মিশ্র ভাষা যুক্ত ঝুমুর গানের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়- "আল কিনারে নাহর গাছে / বগা বগা ফুল / ফুল কে দেখিয়া ছুরি / ধ্যাচাকে চামড়াইল || "

                                     সামগ্রিকভাবে বলা যায় যে, যেকোন প্রকার ঝুমুর গানই হোকনা কেন, তার মধ্যে কখনও অনড় নিয়ম থাকতে পারে না। দেখা গেছে, একটি বিশেষ ঝুমুর গান অঞ্চল, জাতি বা সম্প্রদায় ভেদে ভিন্নরূপ গ্রহন করেছে। কোথাও দেখা যায় সাহিত্যের, কোথাও দেখা যায় সুরের ভঙ্গির এবং উচ্চারনের পরিবর্তন ঘটেছে। তবে যাই হোক, রাঢ় বাংলার অন্যান্য গানের ধারাগুলির মধ্যে ঝুমুর গান বিশেষ ভঙ্গি, সাহিত্য, সুরবৈচিত্র্য, যন্ত্রানুসঙ্গ এবং নৃত্যের প্রয়োগে আপন মহিমায় জনপ্রিয়তার সঙ্গে প্রচলিত হয়ে চলেছে।

Sunday, 29 October 2017

ঝুমুরের গঠনরীতি

দেশীয় লোকসংগীতের মঘ্যে ঝুমুর অন্যতম প্রধান। ঝুমুর রচনার বহুবিধ কৌশল আছে। ছোট ছোট ঝুমুরের গানে সুর বা ছন্দের বৈচিত্র্যের জন্য বহুবিধ গঠন রীতির উদ্ভব হয়েছে। ঝুমুরের কয়েকটি শ্রেণীর মধ্যে একই ধরনের গঠনপ্রণালী পরিলক্ষিত হয়। পালাবন্দী ঝুমুরে এই বৈশিষ্ট চোখে পড়ে। ঝুমুরের একাংশে ‘পয়ার’ বা ‘ত্রিপদী’ থাকে অপরাংশে ‘রঙ্গ’ থাকে। আবার অনেক ঝুমুরের প্রারম্ভে দুই চরণ বা চারিচরণ ‘পয়ার’ বা ‘ত্রিপদী’ সন্নিবেশিত হয় এবং তারপর ‘রঙ্গ’ থাকে। এই রঙ্গ অধিকাংশ স্থলে এক চরণ থেকে চারচরণ পর্যন্ত হয়ে থাকে। প্রাচীন ঝুমুর গায়করা ঝুমুরের প্রথম পংক্তিকে ‘ধুয়া’ এবং পরবর্তী অন্ত্যমিলযুক্ত পক্তিকে ‘পরধুয়া’ বলতেন। প্রথমে ঝুমুরগায়ক ত্রিপদী বা পয়ারাংশ আবৃত্তি করেন, তখন বিশেষ সুরের আড়ম্বর থাকেনা। এরপর ঝুমুরগায়ক ‘রঙ্গ’ ধরেন, সেইসঙ্গে বাদ্য ও নৃত্য আরম্ভ হয়। ‘রঙ্গ’ গাওয়ার সময় সুর,তাল, নৃত্যভঙ্গিমার সমারোহ একইসঙ্গে প্রবলভাবে দেখা যায়। ঝুমুর পালায় প্রারম্ভে গণেশ, সরস্বতী, শিবদুর্গা প্রভৃতি হিন্দুদেবদেবীর বন্দনা গীত থাকে। ইহাকে আবাহনগীত বলা হয়। কিন্তু কোন ঝুমুর পালায় ‘গৌরচন্দ্রিকা’ থাকে না। পরবর্তী পয়ারাংশে পৌরাণিক প্রসঙ্গের অবতারণা হয়ে থাকে। এই পয়ারাংশেই ‘ভণিতা’ অর্থাৎ রচয়িতার নাম উল্লেখিত থাকে। 


ঝুমুরে রঙ্গের প্রাধান্য খুব বেশি। নাচের প্রাধান্য ও বাহুল্য রক্ষা করায় রঙ্গের আধিক্য রয়েছে। কতগুলি ঝুমুর উক্তি-প্রত্যুক্তির মাধ্যমে শুরু হয়, পরে রঙ্গ দেওয়া হয়। ঝুমুর পদের বা চরণগুলির অন্তমিলের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে-

vএমন কতগুলি ছোট ছোট ঝুমুর আছে যাদের গঠনকারী চরণগুলির মধ্যে একটির সহিত অপরটি অন্ত্যমিল নাই।
vকতগুলি ঝুমুর এমনভাবে গঠিত যে  তাদের মধ্যে কতগুলি অন্তমিল যুক্ত জোড়া পক্তি আছে, তাদের শেষ অক্ষরের সঙ্গে ‘ধুয়ার’ অন্তর্গত অন্ত্যমিলযুক্ত পদটির শেষ অক্ষরের মিল নাই।
vকয়েক প্রকার ঝুমুরের সমস্ত চরণে আগাগোড়া একই অক্ষরের মিল দেখতে পাওয়া যায়।

ত্রিপদীর পদগুলি কখনো কখনো দীর্ঘ হয়। দীর্ঘ ত্রিপদীতে আটমাত্রাযুক্ত পদ দেখা যায়। ত্রিপদীতে মাত্রাবৃত্ত ছন্দের ব্যাবহার করাই ঝুমুর কবিদের প্রধান উদ্দশ্য। ত্রিপদীর পাঁচালী প্রকৃত নৃত্যরসকে সৃষ্টি করে। পয়ারে একটি ছত্রে সচরাচর মোট চোদ্দটি অক্ষর থাকে। বাংলা কবিতার ছন্দের দিক থেকে দেখতে গেলে ঝুমুরের গঠনে ‘পয়ার’ ও ‘ত্রিপদী’ এর আধিপত্যই সর্বাপেক্ষা অধিক। তবে অন্যান্য মিশ্র ছন্দও লক্ষ্য করা যায়।

Friday, 27 October 2017

ঝুমুর গানের উদ্ভব ও বিকাশ

ঝুমুর পশ্চিমবাংলার পশ্চিম সীমান্তের সবচেয়ে জনপ্রিয় লোকসঙ্গীত বিশেষ। পল্লীগীতির সহিত বাংলার পশ্চিম প্রান্ত এবং ছোটনাগপুরের আদিবাসীদের সুর মিলিয়ে মিশিয়ে ঝুমুরের উৎপত্তি। প্রান্তিক জনজীবন থেকেই এর উদ্ভব। জীবনের পথ চলতে চলতে মানুষের মুখেই তৈরি হয়েছিল ঝুমুর গান, ‘তুমি আমার কালো সোনা/ হেই হেই কালো সোনা/ তুমি ছেড়ে গেলে আর আমি বাঁচব না/ মরি মরি বাঁচবো না’। ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চলের আদিবাসীরা ছিল প্রধানত কৃষি নির্ভরশীল। আদিম জনজাতির ঝুম চাষ নির্ভর কৃষি কর্মের সহায়ক সঙ্গীতের সুত্রেই এই অঞ্চলে উদ্ভুত হয়েছিল ‘ঝুমুর’ গীত। ভৌগোলিক, প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং সামাজিক চিন্তা ভাবনা ও বিশ্বাস-সংস্কারের বিভিন্ন রুপ নানাভাবে যুগ যুগ ধরে আত্মপ্রকাশ করেছে ঝুমুর গীতের প্রবাহে। সাহিত্যবিদ সুকুমার সেনের মতে- 
             ‘নাট্য গীতের একটি ধারা ঝুমুর নামে পরিচিত ছিল। এই নাট্য গীত পালায় কোন গদ্য সংলাপ থাকত না। পুরো পালাটাই ছিল গানের। সংস্কৃতে ঝুমুরকে বলা হত জম্ভলিকা। জম্ভলিকা নাচ হইতে আসিয়াছে রাজস্থানী ঝামাল গান। বাংলায় ইহা একদিকে ধামানীতে ও অপরদিকে ঝুমুর-এ পরিণত’। সুকুমার সেনের মত গ্রহণ করলে, হয়তো সাঁওতালি বা বাংলা ঝুমুর নাচ ও গানকে সংস্কৃতভাষীরা জম্ভলিকা বলতো। কেউ বলেন নূপুর বা ঘুঙুরের সাথে ঝুমুর গানের সম্পর্ক আছে। আবার অনেক বলে থাকেন ঝুমরি রাগের বা সুরে পরিবেশিত গানগুলোই ঝুমুর গান নামে পরিচিতি লাভ করেছিল। 
                                     
                                     

গোড়ায় এর কোন লিখিত রুপ ছিল না, মানুষের শ্রুতিতেই রুপ বদলাতে বদলাতে ঝুমুরের বেঁচে থাকা। মুখে মুখে তৈরি হয়েছে বলেই এক মুখ থেকে আরেক মুখে পৌঁছতে পৌঁছতেই বদলে যায় কথা, সুরেও বদল আসে। বদলে যায় গায়কীর ঢঙ। মুখে মুখে তৈরি বলেই এই গানগুলি অপেক্ষাকৃত সংক্ষিপ্ত। দু-চার লাইনের গানই বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে গাওয়া হত। চাষ করতে করতে মুখে মুখেই তৈরি হয়ে যেত টাঁড় বা মাঠের ঝুমুর। এই গানের খানিকটা আদিরসেরো ছোঁয়া থাকতো। সহজ সরল কথা ও সুরে ধরা পড়ত তাদের রোজকার জীবনের সুখ দুঃখ। এছাড়াও ছিল হাক্কা ঝুমুর। এ গান গাইতেন মূলত মেয়েরা। আবার গানের তাল ও নাচ অনুযায়ী অনুসরণে ঝুমুর গানের একটা নামকরণ করা হত। বাউল সুরে গাওয়া হলে তাকে বলা হত বাউল ছোঁয়া বা ঢুয়া। আবার কীর্তনের সুরে গাইলে তাকে বলা হত নাচনীশালিয়া। আবার দাঁড় নাচের আসরে গাইলে তাকে দাঁড়শালিয়া বলা হয়-‘তুমি তরু, আমি লতা, বেড়িয়ে রাখব হে/ যাও দেখি কোথা যাবে আমারে ছাড়িয়ে হে/ শিশিরে কি ধান ফলে বিনা বরষনে হে/ বচন কি মনে মিলে বিনা দরশনে হে’। অনেক সময় ঝুমুর গানের নাম হয় তালের নামে, যেমন খেমটি, বাড়হাইয়া। ঝুমুর গানে নাট্যগীতি বলতে অভিনয় মূলক প্রদর্শনকে বোঝানো হয়। সামগ্রিক বিচারে বলা যায়, কৃষি নির্ভর আদিবাসী অধ্যুষিত মালভূমি অঞ্চলের আদিম জীবন সংগ্রাম ও লোকবিশ্বাসের ধারা অনুসরণ করেই ঝুমুর গীতের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছে।

সাম্প্রতিক কালের ঝুমুরিয়া শিল্পীগণ

আধুনিক যুগের ঝুমুরিয়া শিল্পীদের ঝুমুর রচনায় সর্বাধুনিক চিন্তা-ভাবনার ছাপ পড়েছে। সলবত মাহাত, কৃত্তিবাস কর্মকার, কুচিল মুখোপাধ্যায়, ধ্রুবসিং...