Sunday, 29 October 2017

ঝুমুরের গঠনরীতি

দেশীয় লোকসংগীতের মঘ্যে ঝুমুর অন্যতম প্রধান। ঝুমুর রচনার বহুবিধ কৌশল আছে। ছোট ছোট ঝুমুরের গানে সুর বা ছন্দের বৈচিত্র্যের জন্য বহুবিধ গঠন রীতির উদ্ভব হয়েছে। ঝুমুরের কয়েকটি শ্রেণীর মধ্যে একই ধরনের গঠনপ্রণালী পরিলক্ষিত হয়। পালাবন্দী ঝুমুরে এই বৈশিষ্ট চোখে পড়ে। ঝুমুরের একাংশে ‘পয়ার’ বা ‘ত্রিপদী’ থাকে অপরাংশে ‘রঙ্গ’ থাকে। আবার অনেক ঝুমুরের প্রারম্ভে দুই চরণ বা চারিচরণ ‘পয়ার’ বা ‘ত্রিপদী’ সন্নিবেশিত হয় এবং তারপর ‘রঙ্গ’ থাকে। এই রঙ্গ অধিকাংশ স্থলে এক চরণ থেকে চারচরণ পর্যন্ত হয়ে থাকে। প্রাচীন ঝুমুর গায়করা ঝুমুরের প্রথম পংক্তিকে ‘ধুয়া’ এবং পরবর্তী অন্ত্যমিলযুক্ত পক্তিকে ‘পরধুয়া’ বলতেন। প্রথমে ঝুমুরগায়ক ত্রিপদী বা পয়ারাংশ আবৃত্তি করেন, তখন বিশেষ সুরের আড়ম্বর থাকেনা। এরপর ঝুমুরগায়ক ‘রঙ্গ’ ধরেন, সেইসঙ্গে বাদ্য ও নৃত্য আরম্ভ হয়। ‘রঙ্গ’ গাওয়ার সময় সুর,তাল, নৃত্যভঙ্গিমার সমারোহ একইসঙ্গে প্রবলভাবে দেখা যায়। ঝুমুর পালায় প্রারম্ভে গণেশ, সরস্বতী, শিবদুর্গা প্রভৃতি হিন্দুদেবদেবীর বন্দনা গীত থাকে। ইহাকে আবাহনগীত বলা হয়। কিন্তু কোন ঝুমুর পালায় ‘গৌরচন্দ্রিকা’ থাকে না। পরবর্তী পয়ারাংশে পৌরাণিক প্রসঙ্গের অবতারণা হয়ে থাকে। এই পয়ারাংশেই ‘ভণিতা’ অর্থাৎ রচয়িতার নাম উল্লেখিত থাকে। 


ঝুমুরে রঙ্গের প্রাধান্য খুব বেশি। নাচের প্রাধান্য ও বাহুল্য রক্ষা করায় রঙ্গের আধিক্য রয়েছে। কতগুলি ঝুমুর উক্তি-প্রত্যুক্তির মাধ্যমে শুরু হয়, পরে রঙ্গ দেওয়া হয়। ঝুমুর পদের বা চরণগুলির অন্তমিলের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে-

vএমন কতগুলি ছোট ছোট ঝুমুর আছে যাদের গঠনকারী চরণগুলির মধ্যে একটির সহিত অপরটি অন্ত্যমিল নাই।
vকতগুলি ঝুমুর এমনভাবে গঠিত যে  তাদের মধ্যে কতগুলি অন্তমিল যুক্ত জোড়া পক্তি আছে, তাদের শেষ অক্ষরের সঙ্গে ‘ধুয়ার’ অন্তর্গত অন্ত্যমিলযুক্ত পদটির শেষ অক্ষরের মিল নাই।
vকয়েক প্রকার ঝুমুরের সমস্ত চরণে আগাগোড়া একই অক্ষরের মিল দেখতে পাওয়া যায়।

ত্রিপদীর পদগুলি কখনো কখনো দীর্ঘ হয়। দীর্ঘ ত্রিপদীতে আটমাত্রাযুক্ত পদ দেখা যায়। ত্রিপদীতে মাত্রাবৃত্ত ছন্দের ব্যাবহার করাই ঝুমুর কবিদের প্রধান উদ্দশ্য। ত্রিপদীর পাঁচালী প্রকৃত নৃত্যরসকে সৃষ্টি করে। পয়ারে একটি ছত্রে সচরাচর মোট চোদ্দটি অক্ষর থাকে। বাংলা কবিতার ছন্দের দিক থেকে দেখতে গেলে ঝুমুরের গঠনে ‘পয়ার’ ও ‘ত্রিপদী’ এর আধিপত্যই সর্বাপেক্ষা অধিক। তবে অন্যান্য মিশ্র ছন্দও লক্ষ্য করা যায়।

No comments:

Post a Comment

সাম্প্রতিক কালের ঝুমুরিয়া শিল্পীগণ

আধুনিক যুগের ঝুমুরিয়া শিল্পীদের ঝুমুর রচনায় সর্বাধুনিক চিন্তা-ভাবনার ছাপ পড়েছে। সলবত মাহাত, কৃত্তিবাস কর্মকার, কুচিল মুখোপাধ্যায়, ধ্রুবসিং...