Tuesday, 24 October 2017

ঝুমুরগীতের বৃহত্তর পরিমণ্ডল

বাংলার লোকগানকে আমরা চারটি অঞ্চলে ভাগ করতে পারি- উত্তরে ভাওয়াইয়া, পূর্বে ভাটিয়ালি, মধ্য ও দক্ষিণে বাউল এবং পশ্চিমাংশে ঝুমুর। একমাত্র বাউল ছাড়া বাংলার আর কোন সঙ্গীতধারা এত বিস্তৃত এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে নেই। ঝুমুর গান হল বাংলার পশ্চিম সীমান্তবর্তী অঞ্চলের সবচেয়ে জনপ্রিয় লোকসঙ্গীত। পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বর্ধমান, বীরভূম, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুরে ঝুমুর গান ও নাচ লক্ষ্য করা যায়। শুধু বাংলা নয় ঝুমুর ছড়িয়েছে বাংলার বাইরেও। বিহারের ধানবাদে ঝুমুর গান ও নাচের বেশ চল আছে। ঝুমুর দেখা যায় উত্তরবঙ্গ ও আসামেও। বাংলার পশ্চিম সীমান্ত সংলগ্ন ঝাড়খন্ডের সাঁওতাল পরগণা, সিংভূম, রাঁচি, হাজারিবাগ পালামৌ, গিরিডি, ধানবাদ ও বোকারো জেলা এবং ওড়িষার ময়ূরভঞ্জ, সুন্দরগড়, কেঁওনঝাড় ও সম্বলপুর জেলা ইত্যাদি এক বিস্তীর্ণ এলাকায় ঝুমুর গান বিশেষ জনপ্রিয়। বাংলা এবং উড়িয়া ভাষা ছাড়াও কুরমালি, পাঁচপরগনিয়া এবং নাগপুরিয়া প্রভৃতি স্থানীয় উপভাষাতেও ঝুমুর গান হয়। এসব উপভাষা-ভাষী লোক যতদূর অবধি ছড়িয়েছেন ততদূর মুখে মুখেই ছড়িয়ে গেছে এই গান।


ঝুমুরের বিপুল ঐতিহ্য পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চল পুরুলিয়াকে অতিক্রম করে সমগ্র ছোটনাগপুর মালভূমির বিস্তীর্ণ এলাকা ছাড়িয়ে মধ্যভারতের গুজরাট সীমা পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে। এই প্রসঙ্গে বিশিষ্ট লোক-সংস্কৃতি বিজ্ঞানী আশুতোষ ভট্টাচার্যের মত বিশেষভাবে গ্রহণযোগ্য- “ছোটনাগপুর হইতে আরম্ভ করিয়া সমগ্র মধ্যভারত ব্যাপিয়া গুজরাটের সীমা পর্যন্ত যে আদিবাসী বসতি সীমা অগ্রসর হইয়া গিয়াছে, তাহার সর্বত্র যে আদিবাসী সঙ্গীত প্রচলিত আছে, তাহা সাধারণভাবে ঝুমুর নামে পরিচিত”। ঝুমুর বৃহত্তর ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চলের আদিম জীবন সম্ভূত বিশিষ্ট সঙ্গীত। আধুনিক লোকসংস্কৃতি বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এই অঞ্চলের লোকসংস্কৃতি ও তার অন্যতম নিদর্শন ঝুমুরগীতের ঐতিহ্যের মধ্যে থেকে লাভ করা যায় হারানো অতীতের বহু নিদর্শন। প্রাগৈতিহাসিক সভ্যতা ও সংস্কৃতির লীলাক্ষেত্র হিসাবে সুপরিচিত প্রাচীন গন্ডোয়ানাভূমি বা ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চলই বৃহত্তর ঝুমুর পরিমণ্ডল।

No comments:

Post a Comment

সাম্প্রতিক কালের ঝুমুরিয়া শিল্পীগণ

আধুনিক যুগের ঝুমুরিয়া শিল্পীদের ঝুমুর রচনায় সর্বাধুনিক চিন্তা-ভাবনার ছাপ পড়েছে। সলবত মাহাত, কৃত্তিবাস কর্মকার, কুচিল মুখোপাধ্যায়, ধ্রুবসিং...