Monday, 23 October 2017

ঝুমুরের প্রাচীনত্ব ও ইতিহাস

রাঢ় বাংলার লোকসংগীতের অন্যতম প্রাণ সম্পদ ঝুমুর গান। বহু প্রাচীন কাল থেকেই ঝুমুর গানের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায় | তবে বিভিন্ন সময়ে এই সংগীতের রূপ রেখার নানা পরিবর্তন ঘটেছে। বাংলা মঙ্গলকাব্য, চৈতন্যদেবের আগেও ঝুমুর গানের অস্তিত্ব চোখে পড়ে। বড়ু চণ্ডীদাস খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতকের মধ্যভাগে আবির্ভূত হয়েছিলেন।বড়ু চন্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে’র আঙ্গিকে লোক-প্রচলিত ঝুমুর ও ধামালী গানের প্রভাব আছে।বিদ্যাপতিও তাহার সমসাময়িক। বিদ্যাপতি তাঁর পদাবলীতে লিখেছেন, 'গওই সহি লোরি ঝুমরি সঅন -আরাধনে যাঞা'। বিদ্যাপতির কিছুকাল পরেই গোবিন্দদাসের আবির্ভাব। গোবিন্দদাসের পদেও পাওয়া যায়, 'মদনমোহন হরি মাতল মনসিজ যুবতী যুথ গাওত ঝুমরী'। সঙ্গীত দামোদরে ঝুমুরের সংজ্ঞা উল্লেখিত রয়েছে। আইন-ই-আকবরীর রচয়িতা আবুল ফজল তাঁর গ্রন্থে ঝুমুর নামক সঙ্গীত পুস্তকের উল্লেখ করেছেন। ১১৭১ বঙ্গাব্দে সাহিত্যিক নিমানন্দ দাসের পদরসসারে ঝুমুরের বর্ণনা চোখে পড়ে। বৈষ্ণব যুগের বহুকাল পূর্বেই ঝুমুরের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়েছে। মোটামুটি স্থিরীকৃত হয়েছে চর্যাপদের রচনার সময় খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকে ঝুমুরের আবির্ভাব।


পূর্বে ঝুমুর গানগুলি মুখে মুখে রচিত হত, কোন ভণিতা বা পদকর্তার আত্মপরিচয় উল্লেখ থাকতো না। একে বলা যায় ঝুমুর গানের আদি যুগ। চৈতন্য পরবর্তী কালের ঝুমুরের কথা ও সুরে ব্যাপক রদবদল ঘটে। এই যুগে ভণিতাযুক্ত ঝুমুরের সূচনা হয় এবং ধীরে ধীরে নৃত্যে মহিলাদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ হলে পুরুষদের মহিলা সেজে দাঁড় নাচে অংশগ্রহণের প্রচলন শুরু হয়। এই কালপর্বকে বলা হয় ঝুমুর গানের মধ্যযুগ বা কাব্যযুগ। এই সময় ঝুমুর গানের ওপর ভিত্তি করে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও কীর্তনের সুরে নাচনী নাচ ও দরবারী ঝুমুরের প্রচলন হয়। ঝুমুরে পুরাণকাহিনি, সহজিয়া বাউলতত্ত্ব এবং রাধা কৃষ্ণের প্রেম বিষয়ক বৈষ্ণব ভক্তিতত্ত্ব স্থান পায়। একসময়ে এই গান রচয়িতাদের বেশিরভাগই ছিলেন বৈষ্ণব। ঝুমুর গানে তাই বৈষ্ণবদের ভক্তিগীতি, কীর্তনের ছায়া পড়েছে। অনেকেই ঝুমুরকে কীর্তনের অঙ্গ বলে মনে করেন। ঝুমুরের সঙ্গে কীর্তন মিলেই যাত্রার উদ্ভব। আবার কীর্তনে মিশেছে বাংলার লোকসঙ্গীতে সুর। রাধাকৃষ্ণের প্রেম ঝুমুর গানের একটা বড় জায়গা জুড়ে রয়েছে। তবে ঝুমুর শুধু তাতেই আটকে থাকেনি। মানুষের সুখ দুঃখও এসেছে তাতে। তবে এটা পরিষ্কার করে বলে নেওয়া ভাল কোন নির্দিষ্ট ধর্ম, প্রথা বা আচার থেকে ঝুমুর গানের উৎপত্তি হয়নি। ঝুমুর গানের চলন হল ধাপে ধাপে ওঠা।আর স্বাধীনতার পর শুরু হল ঝুমুর গানের আধুনিক যুগ। ভারতের স্বাধীনতা পরবর্তী ঝুমুর গান বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যার ওপর রচিত হওয়া শুরু হয়। ঝুমুর গান ও নাচ যারা করেন তারা সবাই প্রান্তিক অর্থাৎ নিন্মবর্গের গরীব মানুষ। কূর্মি, মাহাতো, কুমোর, রাজওয়ার, ঘাটাল, হাড়ি, মুচি প্রভৃতি সম্পদায়ের লোক। এছাড়াও ঝুমুর গান করেন ভূমিজ ওঁরাও, মুন্ডা ইত্যাদি আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ। আরও পরের পর্বে এসে ঝুমুর গান হয়ে উঠল বাঁকুড়া পুরুলিয়ার প্রায় সব স্তরের মানুষের গান। 

No comments:

Post a Comment

সাম্প্রতিক কালের ঝুমুরিয়া শিল্পীগণ

আধুনিক যুগের ঝুমুরিয়া শিল্পীদের ঝুমুর রচনায় সর্বাধুনিক চিন্তা-ভাবনার ছাপ পড়েছে। সলবত মাহাত, কৃত্তিবাস কর্মকার, কুচিল মুখোপাধ্যায়, ধ্রুবসিং...