Friday, 27 October 2017

ঝুমুর গানের উদ্ভব ও বিকাশ

ঝুমুর পশ্চিমবাংলার পশ্চিম সীমান্তের সবচেয়ে জনপ্রিয় লোকসঙ্গীত বিশেষ। পল্লীগীতির সহিত বাংলার পশ্চিম প্রান্ত এবং ছোটনাগপুরের আদিবাসীদের সুর মিলিয়ে মিশিয়ে ঝুমুরের উৎপত্তি। প্রান্তিক জনজীবন থেকেই এর উদ্ভব। জীবনের পথ চলতে চলতে মানুষের মুখেই তৈরি হয়েছিল ঝুমুর গান, ‘তুমি আমার কালো সোনা/ হেই হেই কালো সোনা/ তুমি ছেড়ে গেলে আর আমি বাঁচব না/ মরি মরি বাঁচবো না’। ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চলের আদিবাসীরা ছিল প্রধানত কৃষি নির্ভরশীল। আদিম জনজাতির ঝুম চাষ নির্ভর কৃষি কর্মের সহায়ক সঙ্গীতের সুত্রেই এই অঞ্চলে উদ্ভুত হয়েছিল ‘ঝুমুর’ গীত। ভৌগোলিক, প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং সামাজিক চিন্তা ভাবনা ও বিশ্বাস-সংস্কারের বিভিন্ন রুপ নানাভাবে যুগ যুগ ধরে আত্মপ্রকাশ করেছে ঝুমুর গীতের প্রবাহে। সাহিত্যবিদ সুকুমার সেনের মতে- 
             ‘নাট্য গীতের একটি ধারা ঝুমুর নামে পরিচিত ছিল। এই নাট্য গীত পালায় কোন গদ্য সংলাপ থাকত না। পুরো পালাটাই ছিল গানের। সংস্কৃতে ঝুমুরকে বলা হত জম্ভলিকা। জম্ভলিকা নাচ হইতে আসিয়াছে রাজস্থানী ঝামাল গান। বাংলায় ইহা একদিকে ধামানীতে ও অপরদিকে ঝুমুর-এ পরিণত’। সুকুমার সেনের মত গ্রহণ করলে, হয়তো সাঁওতালি বা বাংলা ঝুমুর নাচ ও গানকে সংস্কৃতভাষীরা জম্ভলিকা বলতো। কেউ বলেন নূপুর বা ঘুঙুরের সাথে ঝুমুর গানের সম্পর্ক আছে। আবার অনেক বলে থাকেন ঝুমরি রাগের বা সুরে পরিবেশিত গানগুলোই ঝুমুর গান নামে পরিচিতি লাভ করেছিল। 
                                     
                                     

গোড়ায় এর কোন লিখিত রুপ ছিল না, মানুষের শ্রুতিতেই রুপ বদলাতে বদলাতে ঝুমুরের বেঁচে থাকা। মুখে মুখে তৈরি হয়েছে বলেই এক মুখ থেকে আরেক মুখে পৌঁছতে পৌঁছতেই বদলে যায় কথা, সুরেও বদল আসে। বদলে যায় গায়কীর ঢঙ। মুখে মুখে তৈরি বলেই এই গানগুলি অপেক্ষাকৃত সংক্ষিপ্ত। দু-চার লাইনের গানই বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে গাওয়া হত। চাষ করতে করতে মুখে মুখেই তৈরি হয়ে যেত টাঁড় বা মাঠের ঝুমুর। এই গানের খানিকটা আদিরসেরো ছোঁয়া থাকতো। সহজ সরল কথা ও সুরে ধরা পড়ত তাদের রোজকার জীবনের সুখ দুঃখ। এছাড়াও ছিল হাক্কা ঝুমুর। এ গান গাইতেন মূলত মেয়েরা। আবার গানের তাল ও নাচ অনুযায়ী অনুসরণে ঝুমুর গানের একটা নামকরণ করা হত। বাউল সুরে গাওয়া হলে তাকে বলা হত বাউল ছোঁয়া বা ঢুয়া। আবার কীর্তনের সুরে গাইলে তাকে বলা হত নাচনীশালিয়া। আবার দাঁড় নাচের আসরে গাইলে তাকে দাঁড়শালিয়া বলা হয়-‘তুমি তরু, আমি লতা, বেড়িয়ে রাখব হে/ যাও দেখি কোথা যাবে আমারে ছাড়িয়ে হে/ শিশিরে কি ধান ফলে বিনা বরষনে হে/ বচন কি মনে মিলে বিনা দরশনে হে’। অনেক সময় ঝুমুর গানের নাম হয় তালের নামে, যেমন খেমটি, বাড়হাইয়া। ঝুমুর গানে নাট্যগীতি বলতে অভিনয় মূলক প্রদর্শনকে বোঝানো হয়। সামগ্রিক বিচারে বলা যায়, কৃষি নির্ভর আদিবাসী অধ্যুষিত মালভূমি অঞ্চলের আদিম জীবন সংগ্রাম ও লোকবিশ্বাসের ধারা অনুসরণ করেই ঝুমুর গীতের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছে।

No comments:

Post a Comment

সাম্প্রতিক কালের ঝুমুরিয়া শিল্পীগণ

আধুনিক যুগের ঝুমুরিয়া শিল্পীদের ঝুমুর রচনায় সর্বাধুনিক চিন্তা-ভাবনার ছাপ পড়েছে। সলবত মাহাত, কৃত্তিবাস কর্মকার, কুচিল মুখোপাধ্যায়, ধ্রুবসিং...