ঝুমুর গানের সুর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় ইহা কোন সঙ্গীত শাস্ত্রের নির্দিষ্ট নিয়মানুযায়ী গতির অনুসরণ করে না।তবে কোন একটি ঝুমুরের সুর সুক্ষ্মভাবে বিশ্লেষিত করলে তার মধ্যে দু-তিনটি রাগিণীর মিশ্রণ ধরা পড়ে। প্রকৃতপক্ষে ঝুমুর দেশীয় লোকসঙ্গীত এবং এর সুর নিজস্ব। সুরের জন্য ঝুমুর অপরের কাছে ঋণী নহে। মোটের উপর বলা চলে, আর্যদের বা হিন্দুদের সংগীত শাস্ত্র ঝুমুরের আদর্শ নিয়ন্ত্রণ করেনি। এরজন্যই সঙ্গীত দামোদরে ঝুমুরকে বর্ণাদি নিয়মের ব্যতিক্রমকারী বলা হয়েছে। ঝুমুর সুরের নাম কোন রাগ-রাগিণীর নামে দ্বারা নির্দিষ্ট হয় না। ঝুমুরের সুরের স্থানীয় নাম প্রচলিত আছে। এক এক স্থানে ঝুমুর সুরের নাম একেকপ্রকার হয়। ঝুমুর সুরের নামকরণের নীতি-
l কোন প্রদেশ বা স্থানের নামানুসারে কতগুলি ঝুমুর সুরের নামকরণ হয়েছে। যেমন- তামাড়, বাগমুড়া, শিখর্যা, গোলোয়ারি ইত্যাদি। রাঁচির তামাড়, মানভূমের বাঘমুন্ডি ও শিখরভূম এবং হাজারিবাগের গোলা নামক স্থানের নামে ঝুমুর সুরের নামকরণ হয়েছে।
l কালানুসারেও ঝুমুরের নামকরণ হয়ে থাকে। যেমন- ভাদরিয়া, চৈতালী। ভাদ্র ও চৈত্র মাসে এই সুরের ঝুমুর গাওয়ার রীতি প্রচলিত থাকায় মাসের নামে এইরুপ নামকরণ হয়েছে।
l তালের নামানুসারে কয়েকটি ঝুমুরের সুর অভিহিত হয়। যথা- খ্যামটা, ছপকা প্রভৃতি। আবার ভাবানুসারেও কতগুলি ঝুমুরের নামকরণ হইয়াছে। যেমন- উদাস্যা, বিবাগ্যা ইত্যাদি।
l ঝুমুরের আসরের নামানুসারে সুরের নামকরণ হয়ে থাকে। যেমন, দাঁড় বা ছৌ এর আসরে ‘দাঁড়-ধরা’ বা ‘ছোহালী’ ঝুমুর গাওয়ার রীতি প্রচলিত আছে।
l মিশ্র সুর থাকলে যাহার সুর ঝুমুরের সাথে মিশে গিয়েছে তার নামেই ঝুমুরগুলির নাম দেওয়া হয়। কীর্তনের ঢঙে যেসব ঝুমুর গাওয়া হয় তাদের ‘কীর্তন-ঝুমুর’ আখ্যা দেওয়া হয়। ‘কাজরী-ঝুমুর’ এইরুপ ভাবেই মিশ্র নাম পেয়েছে।
উক্তরুপ ঝুমুরের সুরগুলির নামকরণ হয়ে থাকলেও এইসব সুরের নাম মুখে মুখেই প্রচলিত। ঝুমুরের শীর্ষদেশে ও সর্বশেষে কোথাও সুরের নাম লিখিত পাওয়া যায়না। তবে ‘ভাদরিয়া’ সুরটি কেবল মুদ্রিত আছে। ঝুমুর গান স্থানীয় ভাষায় রচিত হলেও গীতরচনায় মিশ্র বাংলা ভাষার প্রভাবই বেশী চোখে পড়ে। রাঢ় বাংলার মধ্যে বিহারের ঝাড়খণ্ডের কিছু অংশের অস্তিত্ব আছে বলে দেখা যায়, তাই এখানকার ঝুমুর গানে হিন্দি ভাষার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এই ঝুমুর গানগুলিকে ঝাড়খণ্ডি ঝুমুর বলে আখ্যা দেওয়া হয়। আবার চা বাগান, কয়লাখনি অঞ্চলে প্রভৃতি কর্মস্থলে বিভিন্ন জাতির মানুষের সমাবেশ হয় বলে অর্থাৎ শ্রমিক বৃন্দের মধ্যে একটা মিশ্র ভাষা যুক্ত ঝুমুর গানের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়- "আল কিনারে নাহর গাছে / বগা বগা ফুল / ফুল কে দেখিয়া ছুরি / ধ্যাচাকে চামড়াইল || "
সামগ্রিকভাবে বলা যায় যে, যেকোন প্রকার ঝুমুর গানই হোকনা কেন, তার মধ্যে কখনও অনড় নিয়ম থাকতে পারে না। দেখা গেছে, একটি বিশেষ ঝুমুর গান অঞ্চল, জাতি বা সম্প্রদায় ভেদে ভিন্নরূপ গ্রহন করেছে। কোথাও দেখা যায় সাহিত্যের, কোথাও দেখা যায় সুরের ভঙ্গির এবং উচ্চারনের পরিবর্তন ঘটেছে। তবে যাই হোক, রাঢ় বাংলার অন্যান্য গানের ধারাগুলির মধ্যে ঝুমুর গান বিশেষ ভঙ্গি, সাহিত্য, সুরবৈচিত্র্য, যন্ত্রানুসঙ্গ এবং নৃত্যের প্রয়োগে আপন মহিমায় জনপ্রিয়তার সঙ্গে প্রচলিত হয়ে চলেছে।
No comments:
Post a Comment