Saturday, 4 November 2017

পৌরাণিক প্রসঙ্গে ঝুমুরের বিবর্তন

লৌকিকতার আঙ্গিক ছাপিয়ে ঝুমুর গান প্রভাবিত হয় পৌরাণিক কাহিনী দ্বারা। পুরান কথা উঠে আসে ঝুমুরের গানে। এরফলে ঝুমুর গান পৌঁছে গেল আরও বৃহত্তর সীমানায়। কৃষক-মুজুর শ্রেণী হয়ে ঝুমুর গান প্রবেশ করল আভিজাত বর্গে। সামন্তপ্রভুরা নিজেদের আভিজাত্য বা ঠাট বজায় রাখার জন্য জাঁকজমক করে ঝুমুরের আসর বসাত। উৎকৃষ্ট ঝুমর রচয়িতাদের সমাদরও বেড়ে গিয়েছিল।

পৌরাণিক ঝুমুর:  ষোড়শ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বিক্ষিপ্তভাবে দু'একটি রাধা-কৃষ্ণের লীলাভিত্তিক ঝুমুর গান তৈরি হয়েছিল। পরে পৌরাণিক আখ্যান নির্ভর ঝুমুর তৈরি হতে থাকে। বিশেষ করে হিন্দু পৌরাণিক কাহিনীভিত্তিক ঝুমুরের বিকাশ ঘটেছিল উত্তরবঙ্গ, রাঢ় বাংলা এবং দক্ষিণ-মধ্য বঙ্গে। এক্ষেত্রে বৈষ্ণবধর্মাবলম্বীদের দ্বারা ঝুমর প্রভাবিত হয়েছিল। এর ফলে লৌকিক ভাদরিয়া ঝুমুরের অনুপ্রবেশ ঘটে 'পৌরাণিক ঝুমুর'-এ। সব মিলিয়ে ভাদরিয়া গান মধ্যুযুগে হয়ে উঠেছিল ধর্ম-কর্মের গান। পৌরাণিক ঝুমুরের প্রধান ধারা রাধা-কৃষ্ণের লীলা– “গোবিন্দের লীলা / নিরমল সুখশিলা/ শুদ্ধ জ্ঞান আছিল হে–তিলমাত্র /কাম গন্ধ না ছিল।” 

গাহা ঝুমুর: ১৩৫০ খ্রিষ্টাব্দের পরে নাগরিক সঙ্গীত ধারায় শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ও বিদ্যাপতি বাংলা সাহিত্য এবং সঙ্গীতের নূতন অঙ্গ যুক্ত হয়। সংস্কৃত কাব্য গীতগোবিন্দ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন এবং বিদ্যাপতির রচনার ভিতর দিয়ে কীর্তন-সাহিত্য এবং কীর্তন-গানের আদিপর্বের সূচনা হয়েছিল। এই ধারা বাংলা লোকসঙ্গীতের ঝুমুর গানে নতুন বিষয়বস্তু যুক্ত করার ক্ষেত্র রচনা করেছিল। কথিত আছে ১৫০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে শ্রীচৈতন্য ঝাড়খণ্ডের উপর দিয়ে পুরী থেকে বৃন্দাবন যাত্রা করেন। এই সময় বৈষ্ণবদর্শন বা বৈষ্ণব গানের বিষয় ঝুমুরে সঞ্চালিত হয়। এই সময়ের ভিতরে বাংলা গাহা ঝুমুর পূর্ণতা লাভ করেছিল বলে অনুমান করা যায়। এই সূত্রে অনুষ্ঠানভিত্তিক গাহা গানে পৌরাণিক ভাব ধারা যুক্ত হয় এবং পৌরাণিক ঝুমুরের সূত্রপাত ঘটে।

বৈঠকী ঝুমুর: মধ্যযুগীয় বাংলা গানের ক্রমবিবর্তনের ধারায় বৈঠকী ঝুমুর একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। কারণ এই ঝুমুর থেকেই তৈরি হয়েছিল উনবিংশ শতাব্দীর দরবারি ঝুমুর। বৈঠকী ঝুমুরের শুরুর দিকে স্থানীয় সামন্তপ্রভুরা বড় করে আসার বসিয়ে ঝুমুর গান শুনতো এবং সামন্তপ্রভুরা নিজেদের আভিজাত্য বা ঠাট বজায় রাখার জন্য জাঁকজমক করে ঝুমুরের আসর বসাতো। এই সূত্রেই তৈরি হয়েছিল 'বৈঠকি ঝুমুর'। এই ঝুমুরগুলোর বিষয়বস্তু ছিল লৌকিক ঝুমুর বা পৌরাণিক ঝুমুর।

দরবারি ঝুমুর: মধ্যযুগের শেষের দিকে জমিদার, মানকি, ধনাঢ্য ব্যক্তিদের আনুকূল্যে দরবারি ঝুমুরের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে উনিশ শতকের ব্রিটিশ ভারতের কলকাতায় এ সকল অভিজাত ও ধনাঢ্যদের একাংশের দ্বারা সৃষ্টি হয়েছিল বাবু-সংস্কৃতি। এরা সখের নাট্যদলের জন্য অর্থ ব্যয় করতো। এদের জলসা ঘরে বসতো খেয়াল, ধ্রুপদ, টপ্পা, ঠুমরি গানের আসর। একসময় এই আসরে জায়গা করে নিয়েছিল ঝুমুর ও খেমটা নাচ গান। বাবুদের অর্থ এবং কৌলিন্যের প্রতিযোগিতার সূত্রে উৎকৃষ্ট ঝুমুর দলকে নির্বাচন করা হতো। কে কত উৎকৃষ্টমানের ঝুমুর দলকে দিয়ে অনুষ্ঠান করাতে পারে, তার প্রতিযোগিতা ছিল। এই সূত্রে উৎকৃষ্ট ঝুমর রচয়িতাদের সমাদরও বেড়ে গিয়েছিল। উৎকৃষ্ট ওস্তাদের নামে আসরের গৌরব বাড়ত। এই সূত্রে মধ্যযুগীয় পদকর্তাদের মতো ঝুমুর গানে ভনিতা যুক্ত হতে থাকে। আদি ঝুমুরের সরল বাণীর সাথে যুক্ত হতে থাকে নানা ধরনের কূটকৌশল। ফলে ধীরে ধীরে আদি ঝুমুরের সারল্য নষ্ট হওয়া শুরু হয়। এছাড়া এ সকল গানে আঞ্চলিক শব্দের স্থানে প্রমিত, পরিশীলিত শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটা শুরু হয়। একালে বসে আদি ঝুমুরে ব্যবহৃত শব্দের অর্থ খুঁজে পাওয়ার জন্য প্রাচীন আঞ্চলিক অভিধানের দ্বারস্থ হতে হয়, পক্ষান্তরে দরবারি ঝুমুরে বাণীর কূটকৌশল উদ্ধারের জন্য হন্যে হয়ে গুরুর সন্ধান করতে হয়। অনেক সময় দরবারি ঝুমুরে এক ওস্তাদ অন্য ওস্তাদ বা শ্রোতাদের সামনে, কবি গানের মতো কূট প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতেন। বৈঠকী ঝুমুরে কীর্তনের প্রভাব ছিল। সেকারণে আদি ঝুমুরের বাদ্যযন্ত্রের পাশাপাশি দরবারি ঝুমুরে কীর্তনের খোল ও করতালের ব্যবহার শুরু হয়েছিল। এছাড়া ঝুমুরের এই পর্যায়ে পুরাণ কাহিনির পাশাপাশি সহজিয়া বাউলতত্ত্বের অনুপ্রবেশ ঘটা শুরু হয়েছিল।

No comments:

Post a Comment

সাম্প্রতিক কালের ঝুমুরিয়া শিল্পীগণ

আধুনিক যুগের ঝুমুরিয়া শিল্পীদের ঝুমুর রচনায় সর্বাধুনিক চিন্তা-ভাবনার ছাপ পড়েছে। সলবত মাহাত, কৃত্তিবাস কর্মকার, কুচিল মুখোপাধ্যায়, ধ্রুবসিং...