Sunday, 5 November 2017

ঝুমুরগীতে আধুনিকযুগ

অনেকের মতে চন্ডীদাসের লেখা শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ঝুমুর গানের প্রাচীনতম নিদর্শন। কৃষ্ণকীর্তনের ভাষা বাঁকুড়া, মানভূম তথা ঝাড়খন্ড অঞ্চলের লৌকিক ভাষা। রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা ঝুমুর গানের একটা বড় জায়গা জুড়ে রয়েছে। আবার যে শিক্ষিত গীতাকার ও সুরকাররা এই গানে এলেন তাদের একটা বড় অংশ বৈষ্ণব ভাবধারায় দীক্ষিত হওয়ার ফলে ঝুমুর গানে বৈষ্ণব ভাবধারা ও কীর্তনের সুর আরও বেশি করে প্রবেশ করতে থাকে। মানুষে প্রেমের সঙ্গে মিশে গেল রাধাকৃষ্ণের ধর্মীর প্রেরণা। রাজা-মহারাজা ও বিত্তশালীদের দরবারে গাওয়া উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে প্রভাব যুক্ত দরবারি ঝুমুরে এই বৈষ্ণব ভাবধারার ছাপ স্পষ্ট। সামন্তপ্রভু, জমিদার, ধনাঢ্য ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতায় ঝুমুরগীত বিচিত্রভাবে সৃজনশালী হয়ে ওঠে। ঝুমুরের শিল্পকর্মও পরিশীলিত রুপ পায়। রাধাকৃষ্ণের প্রেম, মিলন ও বিচ্ছেদ বৈষ্ণব পদাবলী প্রভাবিত এই ঝুমুরের বিষয়। রামায়নের বেশ কিছু অংশও এই সময় ঝুমুর গানে ঢোকে। এই সময় থেকেই ঝুমুর গানের নীতিকার ও সুরকারদের মধ্যে শিক্ষিত উচ্চবর্গের মানুষরা আসতে থাকেন।


মৌখিক গানের জায়গায় আসে লিখিত গান। সুরের বৈচিত্র কথা ও উৎকর্ষে কোন নির্দিষ্ট শ্রেণি বা জাতপাতের মধ্যে আটকে না থেকে ঝুমুর গান সাধারণভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করে। আপন খেয়াল মাঠে ঘাটে, আনন্দেবিরহে গেয়ে ওঠা ঝুমুর গান ও নাচেও এল সুনির্দিষ্ট কাঠামো। লোকসাধারনের মধ্যে মেলা প্রাঙ্গণে নাচ গানের প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধি পায়। ফলস্বরুপ দরবারী আসর থেকে ঝুমুর উঠে আসে মুক্ত প্রাঙ্গণে। রাস, দোল উৎসব, চড়ক, ইন্দুপুজো, শিব রাত্রি উপলক্ষে ঝুমুর গাহার জনপ্রিয়তা ব্যপক হারে বৃদ্ধি পায়। লৌকিক সংস্কৃতির ঝুমুর গানের সঙ্গে আসর মাতিয়ে দিল নাচনীদের নাচ। মৌখিক এবং লিখিত ঝুমুর গানের তফাৎ এই পর্ব থেকেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জমিদার আর রাজাদের দরবার পেরিয়ে ঝুমুর হয়ে উঠতে লাগলো মানুষের গান। আধুনিক যুগে ঝুমুরগীতের পরিবেশনরীতির অভিনবত্ব লক্ষ্য করা যায়। হারমোনিয়াম, ডুগডুগি-তবলা সহযোগে ঝুমুরগীত পরিবেশন আধুনিক যুগের ঝুমুরগীতের নবতম সংযোজন। 

No comments:

Post a Comment

সাম্প্রতিক কালের ঝুমুরিয়া শিল্পীগণ

আধুনিক যুগের ঝুমুরিয়া শিল্পীদের ঝুমুর রচনায় সর্বাধুনিক চিন্তা-ভাবনার ছাপ পড়েছে। সলবত মাহাত, কৃত্তিবাস কর্মকার, কুচিল মুখোপাধ্যায়, ধ্রুবসিং...